Showing posts with label ভাবনার স্প্রে. Show all posts
Showing posts with label ভাবনার স্প্রে. Show all posts

Saturday, April 1, 2006

ভাবনার স্প্রে ০০৮

৮. ধন্যবাদ পর্ব

মন্তব্যে রেটিং দেয়া গেলে কেমন হতো? পোস্টের চেয়ে অনেকের মন্তব্যই স্বচ্ছ, যৌক্তিক মনে হয়।

এ সিরিজের আগের দুটো পোস্ট-এ ('কারণ আমরা মাদ্রাসায় পড়ি' এবং 'চিন্তা নিয়ে চিন্তা') সেসব মন্তব্য এসেছে, তার মধ্যে রেটিংয়ে এগিয়ে থাকতেন শোহেইল মতাহির চৌধুরী। পাঁচে সাত দিতাম। উৎসাহ বলুন, ভিন্নমত বলুন, সহনশীল ভঙ্গিতে বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করেন।

পাঁচে ছয় পেতেন উৎস। না, তিনি আমার ব্লগে মন্তব্য করেননি। কিন্তু তাঁর মিম বিষয়ক পোস্টটি উল্লেখযোগ্য। আমার পোস্টটির আনুসঙ্গিক লেখা হিসেবে সম্মান করছি। তার বাকি লেখাগুলো ভাবনার খোরাক যোগায়।

পাঁচে পাঁচ পাবেন মুখফোড়। উপাত্তসহ প্রাসঙ্গিক হয়েছে বক্তব্য। আকাশও পাবেন পাঁচ। আমার মতের সাথে মিলছে না যদিও। কিন্তু বক্তব্যের স্বচ্ছতার জন্য ভালো লেগেছে।

তারপর থাকতেন যৌথভাবে সুমন চৌধুরী ও মহুয়ামঞ্জুরী। মন্তব্যের মধ্যে কেমিস্ট্রি ছিল!

দীক্ষক দ্রাবিড় পেতেন তিন। আরও বেশি পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। বিশেষ করে তাঁর প্রথম পোস্ট 'নতুন ঈশ্বর আবশ্যক'-এর বিষয় ও উপস্থাপনা অন্ধবিশ্বাসের গোড়ায় নাড়া দেয়। তবে ইদানীং ট্যাগট্যাগ খেলার অপেক্ষমান তালিকায় তাঁর নাম দেখে ভালো লাগছে না।

অপ বাক লিখেছেন বিস্তারিত। ভাষাগত কারণে তাঁর মূল বক্তব্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। আমার মতো অবস্থা! পাবেন দুই।

লুনা রুশদী লিখেছেন 'ভালো লেগেছে।' মিনিমালিস্ট হয়ে গেলেন নাকি? বিস্তারিত লিখে ভালো লাগার ব্যাপারটা আরেকটু জানাতে পারতেন। দেখছেন না, আমাদের ভালো লাগাগুলো কেমন গোলমেলে। দুই পাবেন।

হিমু কত পাবেন বলা মুশকিল।আমরা দুজন মুড়ি (চানাচুরসহ) খাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম। মনে পড়ে? তাঁর কাছ থেকে উল্টো আরো দুই পয়েন্ট নিবো। মুড়ি খাবো বলে!

ঝড়ো হাওয়া, শরীফ আবদুল্লাহ, মোঃ আবু সাঈদ, অমি রহমান পিয়াল, সাঈদ আবদুল্লাহকেও ধন্যবাদ মন্তব্য দেয়ার জন্য। মুখফোড় এটাকে হয়তো বলতেন, ব্লগের ধমনীতে রক্ত যুগিয়েছেন তারা।

মন্তব্য লিখেননি অনেকে। কিন্তু লেখা দুটি পড়েছেন (পেজ হিট সংখ্যা দেখে এ অনুসিদ্ধান্ত)। চুপ থেকেছেন। মনে মনে গালি দিয়েছেন হয়তো। পরবর্তী লেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। সবাইকে সহনশীলতার জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য ধরে ধরে তো একচোট নম্বর দিলাম। কিন্তু যদ্দূর জানি, মন্তব্য/মতামত মাছের বাছারের গোল আলু না। নম্বর দিয়ে লেখার সেরাত্ব বা ভালোত্ব কীভাবে বোঝা যায়? আমাদের, মানে ব্লগারদের, রেটিং করার মানদণ্ড কি সমান?

মন্তব্য বা ব্লগপোস্টে তাই এভাবে সংখ্যাভিত্তিক রেটিং দেয়ার বিপক্ষে আমি। পরিসংখ্যান দিয়ে কীভাবে ভুল তথ্য পরিবেশন করা যায়, পরবর্তী কোনো লেখায় তা বলার চেষ্টা করবো।

ভালো থাকবেন।

[- শেষ - ]

ভাবনার স্প্রে ০০৭

৭.

দর্শনচর্চায় আমি অস্তিত্ববাদকে পাশে রাখি। সার্ত্রের মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ লাগে : অস্তিত্ববাদী প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেয়া যায় না। দয়া করে কেউ সার্ত্রের মন্তব্য আমার ব্লগে খুঁজতে যাবেন না। এ ব্লগ খোলার 25 বছর আগে তিনি মারা যান।

(আপনারা জানেন, দর্শনের শপিং মল আর কাচাবাজারও তৈরি হয়েছে। সে জায়গা সয়লাব বিকল্প সব প্রস্তাবে। 'পপুলার দর্শন' আর 'সানগ্লাসওলা অধিবিদ্যা'র জগাখিচুরি! )

'জানি-না বুঝি-না' বলে যেমন বড়াই করা যায়, তেমনি 'এই-দেখুন-আমি-জানি-আর-আপনি-জানেন-না' বলে ইশতিয়াকীয় ভাব নেয়া যায়। দুয়ের সাথেই লোকে পরিচিত। তাই বলে ঝট করে কাউকে মরমীবাদের বাজারে, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মাজারে বা মজহারীয় মসজিদে ছুড়ে ফেলাকে সমর্থন করি না।

লেখালেখিতে মুক্তচিন্তার চর্চা করতে গিয়ে 'বদ্ধচিন্তা' করার পথ আটকে দেয়া কি পরষ্পর-বিরোধিতা না? পাঠক শেষে কোনটা গ্রহণ করবেন, এ সিদ্ধান্ত কি লেখক বলে দেন? পাঠকমাত্রই লেখকের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে নিচু স্তরে থাকেন-- এ ভাবনা কি অহমযুক্ত না?

অন্য দোকানের পচা আপেল খেয়ে আমার দোকানের ভালো আপেলটি যদি কেউ না খান, তাহলে সে সমস্যা আমারও। কীভাবে?

'ফরহাদ মজহার-এর মতো বাম পচে গেলে দুর্গন্ধ ছড়ায়'--এ কথা বলছিলেন না? পচে যাওয়া আপেলটাই কেন মানুষ খাচ্ছে? কারণ যিনি পচা আপেল সাজিয়ে বসে আছেন, তার কৌশলটা 'যৌক্তিক'। (যৌক্তিক না লিখে 'যৌক্তিক' লিখেছি)

যুক্তির মারপ্যাঁচ বোঝা আর তা প্রয়োগ করতে না পারায় যে গরমিল, তা দর্শনগত। বাক্যটি আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যান। 'পচা' আর 'ভালো' যখন একই শব্দ-বাক্য-ভাষা ব্যবহার করে, তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে কৌশলটা পাল্টে নিতে হয়। প্রগতিশীলতা, মুক্তচিন্তার মতো শব্দ কেবল বাতাসেই ভেসে বেড়ায়, মাথায় আঘাত করে না। আমরা তাই পার্থক্য করতে পারি না কোনটা ভদ্রতা আর কোনটা ভণ্ডামি।

'অসৎ'-রা যদি 'আপডেটেড কৌশল' ব্যবহার করে, আপনারা 'সৎ'-রা কেন পুরনো কৌশল নিয়ে অভিমান করবেন? এভাবে 'সৎ' টিকে থাকতে পারবে?

'যা টিকে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে, তাই যৌক্তিক'। হেগেল!

প্রশ্ন করছেন তো? অর্থনৈতিক ক্ষমতাবলে টিকে যাচ্ছে আমেরিকা। তার মানে কি আমেরিকাই যৌক্তিক? হোমওয়ার্ক!

[- পরবর্তী কিস্তি : ভাবনার স্প্রে ০০৮ -]

ভাবনার স্প্রে ০০৬

৬. গুরুমারাবিদ্যা শেখা

এত বিভ্রান্তি! উপায় কী, গুরু?

উপায় : গুরুর কাছ থেকে মুক্ত হওয়া। গুরুমারাবিদ্যা শেখা।

মার্ক্স-পরবর্তী আমলের একটি 'জনপ্রিয়' প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। কার্ল মার্ক্স কি নিজে মার্ক্সবাদী ছিলেন সারাজীবন?

উগ্র-বামপন্থীরা লাল শিং উঁচিয়ে তেড়ে আসবেন না। কোন অর্থে বলছি, খুঁজতে প্রশ্নটা টেনে সময়ের ঘড়ি উল্টোদিকে ঘুরান। হেগেলের সময়ে গিয়ে থামুন। দার্শনিক হেগেলকে শ্রদ্ধা করি আমি। তাঁর সময়ের একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন তিনি। কারণ, তিনি গুরুমারাবিদ্যা কী তা শিখিয়ে গেছেন। দেখুন, তাঁর দর্শনে 'দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া'র ব্যাখ্যায় অণুপ্রাণিত হন কিয়ের্কেগার্ড আর মার্ক্স। তারপর দু জনই হেগেলের ভাববাদকে হেগেল-দর্শনের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। সেখান থেকে একদিকে পেলাম ধর্মীয় অস্তিত্ববাদ, অন্যদিকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। জ্যঁ পল সার্ত্রে এসে আবার গুরুমারাবিদ্যা প্রয়োগ করলেন। ছেড়ে দিলেন না আগের মতবাদকে। কিয়ের্কেগার্ডের অস্তিত্ববাদে যে ধর্মগন্ধ ছিল, তাকে আবার অস্তিত্ববাদের কাঠগড়ায় তুললেন। এভাবে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া চলছে। অনেক আগে থেকেই। এখনও।তবে সেটা কীভাবে চলছে, তার ইতিহাসটা আমাদের জানতে হবে। এ গুরুমারাবিদ্যা যত শিখতে পারবো, ততই বিভ্রান্তির ফাঁদগুলো স্পষ্ট হবে।

গুরুমারাবিদ্যা শেখার প্রথম উপায় হলো প্রশ্ন করা। দ্বান্দ্বিক উপায়ে প্রশ্ন করা।

সমাজ পরিবর্তন (বা রূপান্তর) হচ্ছে কেন? পরিবর্তনটা কোনমুখী সে কথায় আসা যাবে, কিন্তু তার আগে, কেন হচ্ছে পরিবর্তন? অনুচ্ছেদের ঠিক এ জায়গায় এই প্রশ্ন জানতে চাইলে উত্তর পাবেন : গুরুমারাবিদ্যা জানা কিছু লোক প্রশ্ন করছেন বলে। কেউ না কেউ প্রশ্ন করছেনই। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন-উত্তর চলছে।

তা গুরুমারাবিদ্যা কীভাবে শিখবো? এক গুরুর লেকচার শুনে আর এক লেখকের বইপত্তর পড়ে কি গুরুমারাবিদ্যা শেখা যায়?

গুরুমারা প্রশ্নও আছে। কেমন করে 'প্রশ্ন' করতে হয়? প্রশ্ন করবো কেন? অথবা একজন গুরু কেন গুরুমারাবিদ্যা শেখাতে চান? গুরুমারাবিদ্যা কি গুরুবাদকেই নাকচ করে না?

ভাবনার স্প্রে চলছে...

মার্ক্স মার্ক্সবাদী ছিলেন কিনা সে প্রশ্ন করেছিলাম। একই রকম প্রশ্ন ঢালতে পারি নিজ নিজ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কড়াইয়ে। যিশু খ্রিস্টান ছিলেন কিনা অথবা মুহম্মদ মুসলমান ছিলেন কিনা...

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান, বা আমাদের 'আলোচ্য অংশের মাদ্রাসা' কি গুরুমারাবিদ্যা শেখাতে পারে?

এ বিচারে আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন করতে পারেন। আমি, মানে এক্ষেত্রে ইশতিয়াক জিকো কি সন্দেহের উর্দ্ধে? ভাবনার নামে বিভ্রান্তির স্প্রে ছিটাচ্ছি না তো? অথবা গিমিক বা স্টান্টবাজি? অবান্তর নয় প্রশ্নগুলো। প্রয়োজন আছে। একজন মানুষ 'সৎ' না 'অসৎ', তা যাচাই করার জন্যও গুরুমারাবিদ্যা কাজে লাগে।

তাহলে সরদার ফজলুল করিম বলুন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলুন, বদরুদ্দীন উমর, হুমায়ূন আজাদ, আনু মুহম্মদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলুন, অথবা, অথবা আমাদের 'আলোচ্য ফরহাদ মজহার'-ই বলুন, স্টাডি করে কেউ এমনটা বলতে পারেন, আমাদের সময়ে তাঁরা 'গুরুমারাবিদ্যা কী' তা শিখিয়ে গেছেন, যাচ্ছেন। অথবা এটা বলা হয়তো আরো যুক্তিসংগত : তাদের কাছ থেকে আমরা গুরুমারাবিদ্যা কী তা শিখে নিতে পারি।

কিন্তু শিখবো কীভাবে? বিজ্ঞাপনের আড়ালে বাস্তবরাজ্য যে বড়ই বাস্তব! গুরুমারাবিদ্যা শেখার জন্য প্রশ্ন করতে হয়। নতুন নতুন প্রশ্ন করতে হলে জানার পদ্ধতিটা জানতে হয়। আমাদের যে অতো সময় নেই, গুরু! কোন সময়ে কোন রিংটোন ডাউনলোড করবো, তার হিসাবনিকাশ করতেই জীবনটা তেজপাতা হয়ে যায়!

'উ' নামে বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রগামী এক পরিচিতজনের সাথে আলাপ করছিলাম। কথাপ্রসঙ্গে বললেন, সায়ীদ স্যার কেমন যেন বদলে গেছেন। এতদিন 'আলোকিত মানুষ'-এর কথা বলতেন, এনজিও'র খপ্পরে পড়ে এখন বাপা আর 'বইয়ের আলোকিত গাড়ি'র কথা ভাবেন। সারাদিন কিছু 'উপমন্ত্রী'বেষ্টিত থাকেন বলে তাকে কিছু বলাও যায় না।

'উ'-কে ধন্যবাদ দিই। তিনি গুরুমারাবিদ্যা শিখছেন।

ধন্যবাদ সায়ীদ স্যারকেও। আলোকিত কিছু মানুষ নিশ্চয়ই তৈরি করেছেন তিনি। তাই তাঁর 'আলোকিত-ইজম' আর তার ফলাফলকেও প্রশ্নের বাইরে রাখছি না আমরা।

টিকে থাকার লড়াইটা সত্যিই বৈচিত্র্যময়।

যারা হোমওয়ার্ক পছন্দ করেন : প্রশ্ন করা মানেই কি বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া? আর শুধু সংশয়বাদীরাই কি প্রশ্ন করেন?

[- পরবর্তী কিস্তি : ভাবনার স্প্রে ০০৭ -]

ভাবনার স্প্রে ০০৫

৫. আলোকিত বিজ্ঞাপনের আড়ালে...

জ্ঞানরাজ্য চ্যানেলের বিজ্ঞাপন শুনলেন।
এবার ঢাকার মাটিতে নেমে আসুন।
চে গুয়েভারা এখানে ক্রয়সীমার নাগালে।

ঠোঁটে-সিগারেটসহ চে গুয়েভারার ছবিওলা গেঞ্জি, চাবির রিং, পোস্টার বিক্রি হচ্ছে বঙ্গবাজারে, নিউমার্কেটে। কারা কিনছে এসব? চলে যান উত্তরার কুকুরওলা বাড়ির ভেতরের রুমে। চে'র পোস্টার ঝুলছে দেয়ালে, টম ক্রুজ আর ইমরান হাশমির পোস্টারের পাশে। প্রাথমিক কারণ খুঁজতে হলে বাড়ির টিনএজ মেয়েটির মনোজগতে প্রবেশ করুন, অনুমতি নিয়ে।

শুনতে পাচ্ছেন? তার কাছে পোস্টারের সবাই সমান। তিনজনই স্বপ্নের পুরুষ! এবং তারা নাকি একই কাতারের!

চে'র স্যান্ডো গেঞ্জি পেয়ে যাবেন এমন কারো শরীরে, যার অন্তর্বাসে চিকচিক করছে আমেরিকার পতাকা আর ব্রিটনি স্পিয়ার্স। অথবা গেঞ্জিটি শোভা পাচ্ছে কিশোরীর-মন-পেতে-অস্থির সদ্য-কৈশোরে-পা-দেয়া স্বপ্নাতুর কোনো ছোট্ট রাজপুত্রের গায়ে। চে একটা বিকল্প ফ্যাশন। আধুনিক ক্রেজি আইকন।

বাস্তবরাজ্যে কীভাবে চে একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়, এ প্রশ্নও টুকে রাখুন।

চ্যানেল পাল্টাবেন না। বাস্তবতার আরো চিত্র দেখুন।

হারুন ইয়াহিয়ার 'সত্যের আমন্ত্রণ' গোছের ভিডিও সিডি পাবেন গুলিস্তানের পাইরেটেড সিডি বাজারে। পর্নোসিডির চাইতে কম বিক্রি হয় না সেসব সিডি ডিভিডি। (দর্শনগত বিচারে দুটো অবশ্য একই রোগের ট্যাবলেট, পার্থক্য শুধু ব্র্যান্ডে। নাপা আর প্যারাসিটামল!)

কারা এসব সিডির ক্রেতা? চলে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ হলের অক্টোবর ভবনের দোতলায়। বন্ধুত্ব করুন সদ্যভর্তি সেই ছাত্রের সাথে। যার চোখে ঝিলিক দিচ্ছে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ঝাঁঝালো বক্তৃতা, মধুর ক্যান্টিনে চা-সিগ্রেটের ধোঁয়া, আর 'আজিজমার্কেটগামী' বন্ধুর কথার তুবড়ি।

অথবা এ সিডি সযত্নে রাখা আছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, হিজবুত-তাহরীর করা কোনো এক কর্মীর কমপিউটার টেবিলের ড্রয়ারে। ধীরে এগুতে হবে। হয়তো আপনাকে বন্ধু বলে গণ্যই করবে না সে যুবক। বন্ধু তো অনেক ছিল তার, আছেও। জীবনকে জানতে তার নতুন কিছু দরকার। 'নতুন সত্য'। 'নতুন স্বপ্ন'। পৌনঃপুনিক বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে চায় সে।

জগন্নাথ হল আর নর্থসাউথ যুবক। দু জনের কাছেই বামপন্থী-ডানপন্থী এক লাগে। দলে টানতে চায় সবাই। সবাই তাদের মুক্তির স্বপ্ন দেখায়।অমুকপন্থী-তমুকবাদী টাইপের শব্দমালা তাদের হতাশ করে।

আয়নার সামনে সিগারেটের ধোঁয়া প্যাঁচ খায়।

বিড়ালের মতো ন্যাজ উঁচিয়ে পুরনো প্রশ্নটা ফিরে আসছে : বিভ্রান্ত হবেন না কেন?

[- পরবর্তী কিস্তি : ভাবনার স্প্রে ০০৬- ]

ভাবনার স্প্রে ০০৪

৪. মগজের ভেতর চেতনার লোডশেডিং

এবার আসুন, কিছুক্ষণ আপনাকে বিভ্রান্ত করি।

উপরের বাক্যটা কি 'অনৈতিক' শোনাচ্ছে?

তাহলে অলঙ্কার লাগাই : আসুন, কিছুক্ষণ আপনাকে বিভ্রান্ত হবার পথগুলো দেখাই।

বিভ্রান্ত হবার অসংখ্য পথ খোলা। স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক যেহেতু, কোন পথে বিভ্রান্ত হবেন, এটা বেছে নিতে কেউই আপনাকে বিরক্ত করবে না। কারো অতো সময় নাই!

তাহলে শুরু করি এ প্রশ্ন দিয়ে: 'বিভ্রান্ত হবেন না কেন?'

মার্ক্সবাদের গায়ে ইসলামের পাঞ্জাবি পড়াচ্ছেন ফরহাদ মজহার, জিয়াউদ্দিন সরদার, আবুল কাশেমরা। ইসলামের গায়ে বিজ্ঞানের জ্যাকেট পড়াচ্ছেন ডক্টর শমসের আলী। (দেশী মরিস বুকাইলি!)

বিজ্ঞানের গায়ে মরমীবাদের হিজাব পড়াতে শুরু করেছেন 'কসমস'খ্যাত কার্ল স্যাগান।

ওই যে দূরে দেখছেন, চিন্তা ফর্সা করার জন্য মগজে 'রিলিজিয়াস কসমোলজি' আর নিওপ্যানথিজমের ক্রিম মাখছেন বিজ্ঞানের ডিগ্রিওলা ধার্মিক। এবং সে ক্রিম সবাইকে মাখার 'অনুরোধ' করছেন। সহজভাষায় লেখা বলে লুফে নিচ্ছেন হ্যারিপটার্সীয় পাঠক। দেখতে পাচ্ছেন?

হাল আমলের হারুন ইয়াহিয়ার (মূল নাম আদনান অক্তার) কাছে চলুন। মাল্টিমিডিয়াসমৃদ্ধ 'বিজ্ঞানভিত্তিক ইসলামবাদ'-এর বদৌলতে তিনি বেশ জনপ্রিয় হচ্ছেন 'বামধারার ইসলামী' সংগঠনগুলোর মধ্যে। হারুন ইয়াহিয়ার ভিডিও সিডি চালিয়ে ভলিউমটা বাড়িয়ে দিন। বস্তুবাদের বিপক্ষে ঝুনঝুনির আওয়াজ পাওয়া যাবে।

এরকম আরও নানারকম বিন্যাস-সমাবেশ (পারমুটেশন-কম্বিনেশন) চলছে মতাদর্শের রাজনীতিতে। কেউ মৌলবাদের গায়ে নিরপেক্ষতার শার্ট পড়ান, কেউ অজ্ঞেয়বাদের নাম দিয়ে দেহতত্ত্বের লিপস্টিক মাখিয়ে দেন।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতি পুরনো চালবাজি। অন্য কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু তার বিপক্ষেই লড়ে যাচ্ছেন এক দল। এদিকে ফাঁক গলে জ্ঞানপাপী আর সুবিধাবাদীদের সংখ্যা বাড়ছে। ধর্ম ছেড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবতা, আধুনিকতা, আর মুক্তচিন্তার মতো অন্যান্য সংবেদনশীল শব্দের পসরা সাজিয়েছেন তারা। অঞ্চলভেদে শব্দগুলো পাল্টে দেয়া হয় শুধু। সমার্থক ধারণার ইনজেকশান ঠিকই ঢুকছে আমাদের মগজের কোষে। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য 'যুক্তিবাদ' আর 'বুদ্ধিবাদ' ব্যবহারের খবরও শোনা যায়। ভারতে প্রবীর ঘোষের 'অলৌকিক নয় লৌকিক'-এর সব খণ্ড আবার ছাপা হয়েছে। বইয়ের ভূমিকায় দেখি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খুব প্রশংসা করেছেন। রাজনৈতিক প্রশংসা!

বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিতে ডিজুস-বিপণন-কৌশল!

তবে কি মুক্তচিন্তা, মানবতা বলে কিছু নেই? সব ব্যবসায়িক বুজরুকি? এ প্রশ্ন করেছেন বলে ধন্যবাদ। উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করবো আমরা।

তার আগে প্রথম প্রশ্নটা মাথায় রাখুন : বিভ্রান্ত হবেন না কেন?

[- পরবর্তী কিস্তি : ভাবনার স্প্রে ০০৫ -]

ভাবনার স্প্রে ০০৩

৩. পুতুল বানাতে গিয়ে পুতুল হয়ে যাওয়া...

যারা মন্তব্য দিয়েছেন, তাঁরা হয়তো অপেক্ষা করছেন ব্যাখ্যা শোনার জন্য।

অপ বাক-এর প্রশ্নগুলো জোরালো মনে হয়েছে। শিক্ষানীতি নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবনা বিস্তারিত বলা উচিত। আপাতত সংক্ষেপে : প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার বিপক্ষে আমার অবস্থান। এখন গোড়া ধরে টান দেন যদি, রাষ্ট্র তার শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মকে টিকিয়ে রাখছে কেন, এ প্রশ্নের উত্তর, আপনি জানেন, অর্থনীতিতে। মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কার করে তা টিকিয়ে রাখার যুক্তি দেন অনেক। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন, শিক্ষার্থীদের নৈতিক মানদণ্ড (নাকি শুধু ধর্মীয় অনুশাসন?) মজবুত হয়। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধর্ম টেনে আনা হয় কেন? অথবা 'মাদ্রাসাশিক্ষা' তুলে দিয়ে প্রি-ক্যাডেট আর ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের সিলেবাসে ঢুকিয়ে দেয়া হলো, অন্য নামে। তখন? এ উত্তরের সাথে মুখফোড়ের মন্তব্যটি জোড়া লাগাচ্ছি।

তাহলে প্রশ্ন আসে, আমি কেন ফরহাদ মজহারকে হাইলাইট করেছি? সম্ভবত এখানে ভাষাগত ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে আপনার-আমার। ফরহাদ মজহার যুক্তিবিদ্যার মারপ্যাঁচ ভালো জানেন। 'স্বচ্ছতার কারণে লেখা ভালো লাগে' বলতে এটাই বুঝিয়েছি। তাঁর বক্তব্য সমর্থন করছি, এমনটা কেন আগেই ধরে নেয়া?

আরোহী পদ্ধতিতে সিদ্ধান্তে আসার সমস্যা!

যুক্তির (লজিক) বিপক্ষে যে যুক্তি (অ্যান্টি-লজিক), সেটা কি যুক্তি না? তার মানে দুটোই যৌক্তিক? কোনটা 'বেশি যৌক্তিক'?

ভাবনার স্প্রে চলছে...

চিন্তা পত্রিকার বর্তমান সংখ্যা থেকে একটা নমুনা লেখা তুলে ধরার কারণ : তিনি কী বলতে চান এ প্রসঙ্গে, তা জানানো। ব্যাখ্যাসহ ভিন্নমত আশা করছিলাম। পেয়েছিও। ফরহাদ মজহার এবং তাঁর সাহাবীরা ভাষার ব্যবহার নিয়ে বলতে গিয়ে নিজেরা কীভাবে প্রয়োগ করেন, সেটা ইন্টারেস্টিং লেগেছে। খেয়াল করুন আমার আগের পোস্ট, 'ভাষা বিনির্মাণ' বিষয়ে একটা সন্দেহ তুলেছিলাম।

আর কোনো পত্রিকাকে 'আবর্জনা' বলার পক্ষে নই আমি। পত্রিকাগুলো, আমার কাছে, এক ধরনের ইনপুট, উপাত্ত। মান্থলি রিভিউ ভায়া পাক্ষিক চিন্তা ভায়া মাসিক মদিনা-- পত্রিকাগুলো ভর্তি থাকে 'যুক্তি' দিয়ে। পত্রিকাওলাদের জোর দাবি, সেখানে চিন্তকদের লেখা থাকে। লেখায় যুক্তির ফাঁদগুলো ঢাকা থাকে ভাষা দিয়ে, ভাবনা দিয়ে। একটা খেলা চলে।

দীক্ষক দ্রাবিড় : বক্তব্য শুরুই করলেন সিদ্ধান্ত টেনে! আমার 'ফরহাদ মজহারীয় বিভ্রান্তি' নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাই। 'মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিজীবী' কেমন? কারা মূলধারার বুদ্ধিজীবী? আমাদের সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিগণ? মুহম্মদ ইউনূস, হাবিবুর রহমান, শফিক রেহমান?

একটা খাঁটি কথা বলেছেন : 'বাম পচলে যে কত দুর্গন্ধ ছড়ায় ...'। কোটেবল কোটেশন!

সুমন চৌধুরী : আপনার বক্তব্য সমর্থন করছি। খটোমটো লেগেছে 'মার্ক্সের আধা-হেগেলীয়-যুগের কিছু রেফারেন্সগুলো' নিয়ে। মার্ক্সবাদ নিয়ে আরো জানতে আগ্রহী।

বাকিরা প্রাসঙ্গিক উত্তর এর মধ্যেই হয়তো পেয়ে গেছেন। না হলে অপেক্ষা করুন।

আরেকটা স্প্রের বোতল নিয়ে আসি!

[- পরবর্তী কিস্তি : ভাবনার স্প্রে ০০৪ - ]

ভাবনার স্প্রে ০০২

২. আলোচ্য গিমিনাট্যে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন...

স্কুলকলেজে পরীক্ষা দেয়ার সময় মুখোমুখি হতাম : 'আলোচ্য অংশে লেখক কী বোঝাতে চান?'

পাঠ্যপুস্তক থেকে নেয়া 'আলোচ্য অংশ'-এর সেই লেখক কেন জানি সে সময় বেঁচে থাকেন না। তাই পপি-পাঞ্জেরী-আকিজ ঘরানার নোটবইয়ের লেখক দায়িত্ব নেন 'আলোচ্য অংশ' বোঝানোর। এ বোঝা বিশাল বোঝা। দীর্ঘদিন সে বোঝা পিঠে বইবার ফলে ব্যথাটা এখনও পুরোপুরি যায়নি।

টেক্সট-এর অর্থবিচারে কোন পদ্ধতি বেছে নেন আপনি? লেখক কী বলছেন নাকি পাঠক কীভাবে নেবেন? সমালোচনা-পদ্ধতির বহুদিনের বিতর্ক এটা। সিমিওটিকস শাখার সাহায্য নেন কেউ। উপমা বা রূপক নয়। প্রতীক হিসেবে নিয়ে তার অর্থ বিচার করলে নাকি টেক্সটে বহুমাত্রিক অর্থ পাওয়া যায়।

সিমিওটিকস নিয়ে যতটুকু জেনেছি, গিমিনাট্যে তার নিরীক্ষা চালিয়েছি। গিমিনাট্য ডিকোড করলে কেমন হয়, একটা নমুনা দেয়া যাক।

  • সামহ্যোয়ারইন রোড = চিন্তার ভাষা
  • রিকশা, ট্যাক্সি, মোটরসাইকেল = ধারণা [ব্যাপক অর্থে, মিম (meme)। ধারকত্বের ভিন্নতা বোঝাতে তিন শ্রেণীর যান।]
  • রিকশা = মাঝারি ধারকত্বের ধারণা। সরলীকরণ : যেসব ধারণা টিকে যাওয়ার শক্তি মাঝারি মানের।
  • রিকশাচালক = ধারণার পরিবাহক।
  • রাস্তার ধারে দাড়িয়ে থাকা লোক = প্রথম স্তরের পর্যবেক্ষক দল। নতুন ধারণা নিজেদের মধ্যে নেয়ার আগে যুক্তি দিয়ে যাচাই করে নিতে চান।
  • বাঁ পাশের ফুটপাত = বামধারার মতাদর্শ।
  • চোখে সানগ্লাস = যাচাই করার নৈতিক মানদণ্ড।
  • ট্যাগ লাগানো = ধারণাকে সংজ্ঞায়িত করা, শ্রেণীভুক্ত করা
  • ট্যাগট্যাগ খেলা দেখার দর্শক = দ্বিতীয় স্তরের পর্যবেক্ষক। পুরনো ধারণায় আক্রান্ত থাকেন। আবার নতুন ধারণা আসলে তাতেও প্রায়সময় আক্রান্ত হয়ে যান। যুক্তি আর আবেগের সমন্বয় করতে পারেন না।
  • রাস্তার মাঝপথে কিছু লোক শিষ দেয় = পরিবর্তনের সঙ্কটকালে মধ্যপন্থী বিশ্লেষণ করা।
  • লোকদের ফিসফাস আলাপ = প্রচলিত ও নতুন ধারণাগুলোর সংশ্লেষণ (সিনথেসিস) করার চেষ্টা চলে। সংশ্লেষণের বেলায় কেউ বুদ্ধির চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। কেউ 'সত্যই সুন্দর' বা 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর' জাতীয় মহান বাণীগুলো একরকম ঐশ্বরিক জ্ঞান করেন। আলাদা ভাবে না নিয়ে পর্যায়ক্রমে পড়লে আলাপ থেকে নতুন ধারণা বেরিয়ে আসে। পর্যায়ক্রম খেয়াল করুন। 3, 14, 15, 9,2, 6। গণিতের পাই (Pi, irrational number)-এর মান সাথে তুলনীয়। পাই এর মান 3.1415926...।
  • ট্রাফিক পুলিশ = ধারণা-প্রতিধারণার যুদ্ধে চরম সঙ্কট দেখা দিলে এরা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। নিয়ন্ত্রণের সময় উপরের স্তরের নিয়ন্ত্রকের অনুবর্তী থাকেন। তবে নতুন সিদ্ধান্ত টানতে পারেন না। 'ধারণার স্বপক্ষে প্রচুর উদাহরণ' দিলে এদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ঘুষের মতো!
  • নেপথ্য কণ্ঠগুলো = যাত্রাপালার 'বিবেক' বা সক্রেটিস-যুগের সফিস্টদের বর্তমান সংস্করণ। তবে এ বিবেক একইসাথে মনে করিয়ে দিতে চায়, আপনি একটা গিমিনাট্য পড়ছেন। থিসিস পেপারও না, শিল্পকর্মও না। গিমিকও না, চিত্রনাট্যও না। স্রেফ গিমিনাট্য। এক ধরনের মেটা-স্টান্টবাজি।
  • প্রবীণদের আড্ডায় ট্যাগের শব্দগুলোও উঠে আসে = বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে মুক্ত হবার উপায় হিসেবে যারা সমাজ উন্নয়নের কথা ভাবেন।
এভাবে ডিকোড করতে থাকুন। সংকীর্ণ অর্থেও ডিকোড করা যায়। যেমন রাস্তা মানে ওয়েবসাইট, রিকশা মানে ব্লগের লেখা, ট্রাফিক পুলিশ মানে সাইট কর্তৃপক্ষ, ...

জ্ঞানরাজ্যে শৃঙ্খলা আনতে প্রাপ্ত উপাত্ত যাচাই করতে হয়, তথ্যকে সাজিয়ে রাখতে হয়। এই ইনফরমেশন ডিজাইনের বেলায় ট্যাগ লাগানো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু জ্ঞানরাজ্যে ট্যাগ লাগানোই যদি চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়, সেটা শুধু খেলা হয়ে দাড়ায়। আমাদের চিন্তাভাবনার বিশাল সময় এই ট্যাগট্যাগ খেলার পেছনে চলে যায়। জ্ঞানরাজ্যের বাকি কাজ যায় বন্ধ হয়ে।

ট্যাগট্যাগ খেলার সমস্যা কোথায়? দ্রুততায়। ভাষা দিয়ে যোগাযোগের অস্বচ্ছতায়। যেমন : আপনি বলা শুরু করলেন, রবিঠাকুরের গান ভালো লাগে। ট্যাগট্যাগ খেলোয়াড় হিসেবে খপ করে কথাটি কেড়ে নিলাম। 'ও! আমি চিনি গো চিনি তোমারে। তুমি হলে রবীন্দ্র মৌলবাদী। তুমি বদ্ধচিন্তক।' প্রশ্ন করতে যাবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক-ধর্ষণ করবো কিছুক্ষণ। বললাম, 'রবীন্দ্রনাথ নানা কায়দায় ব্রাহ্মসমাজের গুণগাণ গেয়েছেন। সুতরাং তাঁর গানের কথায় মুক্তচিন্তার ছাপ নেই। পুরুষতান্ত্রিক ছিলেন তিনি। নারীদের মানুষ ভাবেননি। শুধু নারী ভাবতেন।...'। এলোপাথারি নির্যাতন চলতে থাকবে যতক্ষণ না আপনার মনোজগতে রক্তক্ষরণ হয়। তারপর ছেড়ে দিলাম। আহ!

ধরতে পারছেন আমার যুক্তির ফাঁদ আর ফাঁক ? কূটাভাষ আর স্ববিরোধিতা? রবীন্দ্রনাথকে 'পুরুষতান্ত্রিক' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলাম। এবং আপনাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, আপনার মনোজগতে ধর্ষণ করলাম। ধর্ষণ করে নিজেকেও 'পুরুষতান্ত্রিক' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলাম।

অনেকেই যুক্তির ফাঁক ও ফাঁদটা ধরতে পারেন না!

আর এভাবে আমি, আমরা টিকে যাই।

[ - পরবর্তী কিস্তি : ভাবনার স্প্রে ০০৩ - ]

ভাবনার স্প্রে ০০১

১. এসব দেখি কানার হাট-বাজার...

এ লেখার আগের দুটো পোস্ট চিন্তা নিয়ে চিন্তা এবং কারণ আমরা মাদ্রাসায় পড়ি-এর মন্তব্যগুলো পড়লাম। একটা বিষয় অদ্ভুত! যারা পোস্টটিতে ভিন্নমত দিয়েছেন, তাদের সাথে আমার মত প্রায় মিলে যায়। আর লেখায় উৎসাহ দিয়ে সহমত পোষণ করেছেন যাঁরা, তাঁদের সাথে মতাদর্শের ভিন্নতা রয়ে যাচ্ছে।

এমনটা মনে হচ্ছে কেন? হতে পারে, বক্তব্য উপস্থাপনায় গলদ আছে। যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখাটি তুলে দিয়েছিলাম, আর লেখাটা যেভাবে নেয়া হয়েছে, দুটোয় মেলেনি। সান্ত্বনা দিলেন আপনি, লেখক-পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গির এ তফাৎটুকু থাকেই।

কিন্তু তাই বলে এত ভিন্নতা?

তাহলে এ কারণ অন্যভাবে বলা যায়, লেখাটি স্বচ্ছ করে লিখতে পারিনি। 'লিখতে পারিনি' কথাটায় বিনয়ের গন্ধ পেলেন। অভিযোগ করলেন, বিনয় হলো উন্নাসিকতা ঢাকার একটা কৌশল! বাক্যের পুনর্বিন্যাস করা হলো : 'স্বচ্ছ করে লিখিনি'। এবার আক্রমণ : 'আপনি আসলে স্বচ্ছ করে লিখতে পারেন না'।

'স্বচ্ছতা' শব্দের অর্থ নিয়েও ব্যক্তিবিশেষে 'অস্বচ্ছতা'।

এ রকম সমস্যা অনেকের বেলায় হয় নিশ্চয়ই। একই ভাষায় যোগাযোগ করি, তারপরও যোগাযোগটা হয় না 'ঠিকমতো'। এসব নিয়ে একটু ভাবনার স্প্রে ছিটাই। বিভ্রান্তির মশামাছিতেলাপোকারা বিরক্ত করছে বেশ...

একটা গিমিনাট্য দিয়ে শুরু করা যাক। খসড়া লিখেছি কেবল। শিরোনাম : 'এসো ট্যাগ লাগাই'। 'প্রাপ্তবয়স্কদের' জন্য রচিত এ গিমিনাট্য পড়ার আগে এর আগের দুটো পোস্ট (মন্তব্যসহ) পড়ে নিন।

<গিমিনাট্য শুরু>

- সিকোয়েন্স এক -
সামহোয়্যারইন রোড। সন্ধ্যাবেলা। রাস্তায় রিকশা, ট্যাক্সি, মোটর সাইকেল আসছে-যাচ্ছে। বাঁ পাশের ফুটপাতে সানগ্লাস চোখে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে। হাতে একগাদা ট্যাগ (স্টিকার বা লেবেল)। বেশিরভাগ চোখ রিকশার ওপর। মাঝে মধ্যে রিকশা আটকাচ্ছেন। পছন্দ না হলে একপাশে নিয়ে যাচ্ছেন। ট্যাগ লাগিয়ে দিচ্ছেন।

ট্যাগ লাগানো এক ধরনের খেলা। পুরনো খেলা। আদর করে 'ট্যাগট্যাগ'-ও বলেন অনেকে। একেক ট্যাগে একেক বিশেষণ লেখা থাকে। দ্রুত লাগাতে হয় এসব ট্যাগ, অনেকে মিলে। দ্রুত খেলতে হয় বলে সমস্যাও হয়। তবে এ সমস্যা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সুবিধা, খেলার জনক কথাটা প্রায়ই বলেন। রাস্তায় কেন এ খেলা? উত্তরে নূরানি হাসি। বলেন, মাঠের খেলা ক্রিকেট। রাস্তার খেলা ট্যাগট্যাগ।

আবার ফিরে যাই সে রাস্তায়, সন্ধ্যাবেলায়, ফুটপাতের ধারে, বাঁ পাশে। ট্যাগট্যাগ চলছে। কেউ ট্যাগ লাগাচ্ছেন রিকশার গায়ে। কেউ লাগাচ্ছেন রিকশাআরোহীর শরীরে, জামায়। রিকশাচালক কিছু বলতে চান। তিনিও 'ট্যাগ খান'।

দুয়েকজন খেলা সমন্বয় করতে এগিয়ে আসেন। এইখানে না, ওইখানে, ওইখানে ট্যাগ লাগাও। এভাবে লাগায় নাকি? কোন ইশকুল থেকে ট্রেনিং নেয়া তোমার? ওই, আঠা শেষ। দোকান থেকে আঠা নিয়ে আসো। কুইক।

শব্দমুখর খেলা। এক বাক্যের শব্দ আরেক বাক্যের ঘাড়ে ওঠে। কে কাকে নির্দেশনা দিচ্ছেন, কেউ তা দেখছেন না। খেলাটাই আসল। হি হি হি।

ট্যাগ ট্যাগা ট্যাগ ট্যাগ
ট্যাগা ট্যাগ ট্যাগা ট্যাগ
(আবহ সঙ্গীত হিসেবে এ নিরীহ মিউজিক বেছে নিলাম। আমরা একটু পর দুই নম্বর সিকোয়েন্সে যাবো। তখন সঙ্গীত আপনাআপনি মিলিয়ে যাবে।)

- সিকোয়েন্স দুই -
রাস্তার এপাশে, ওপাশে ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে। ট্যাগট্যাগ খেলা দেখার লোক। কী-হয়-কী-হয় কৌতূহল। চাপা উত্তেজনা। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস গল্প চলে। এ রাস্তায় নাকি এমন খেলা কারও চোখে পড়েনি।

আরেকজন 3 : সুন্দর খেলা, ভালোই তো লাগছে, মাইরি।
আরেকজন 14 : যাহ, বিদেশ ছিলেম যখন, এমন খেলা কত দেখে এলেম।
আরেকজন 15 : বিদেশ তো আমিও আছিলাম। যাই বলেন, খেলাটা এই রাস্তায় একটা নতুন মাত্রা আনতাছে। আই অ্যাম ফিলিং ইট।
আরেকজন 9: নষ্ট ল্যাম্প পোস্টটার উপরি হেবি রাগ হতিছে। বাতি ঠিক থাইকলে খেলাটা দেইখে বড় সুখ লাইগতো।
আরেকজন 2: বাঙঙঙ গালি! খাইবার দিলে সবটি বইবার চায়। ওমমিয়া, সাইড লন, খেলা দেখবার দ্যান।
আরেকজন 6 : ম্যালা খেলা দেখনু। বাহে, আইসো, মুড়ি খাই।

কেউ আবার উৎসাহ দিতে মাঝরাস্তায় চলে আসেন। দুয়েক বার শিস দিয়েই আবার ভোঁ দৌড় ওপাশে। উফ, ট্রাফিক পুলিশটা আচ্ছা ত্যাঁদোড়। খেলার গ-ও যদি বুঝতো!

খেলা চলছে। ভিড় বাড়ছে। জমে উঠছে। কে জিতবে কে হারবে, দূর থেকে বোঝা যায় না।

জটলা দেখে ট্রাফিক পুলিশ হঠাৎ সম্বিত ফিরে পান। দায়িত্ব, হ্যাঁ, অনেক দায়িত্ব তাঁর। আইন নিজের হাতে তুলে নেন। দেন বাঁশিতে একটা ফু। জোরে। ফুউউউউউ।

ব্যস। জটলা নিমেষে হাওয়া। কী তামশা! হি হি হি।

ইশ, খেলার শেষটা আর দেখা হলো না।
কী হলো? শেষ হলো তো?

- সিকোয়েন্স তিন -
নেপথ্য কণ্ঠ 1 : আজকের যে ঘটনা টাটকা, আগামীকাল তা মিথ (myth)। পরশুদিন মিম (meme)। খবরের কাগজওলারা জানেন সেটা। সেভাবেই 'খবর তৈরি' করেন তাঁরা। আজকে করছেন সচেতনভাবে। পরদিন করেন অবচেতনভাবে।

নেপথ্য কণ্ঠ 2: উমমম... 'যা কিছু ভালো, তার সাথেই' তো থাকবে কাগজওলারা, নাকি? একটু কুশলী তো তখন হতেই হয়। তিরিশটা ভালোর ফাঁকে আধটা 'নির্দোষ কালো' মিশালেই ভালোর 'মানহানি' হয়ে গেল? উমমম... তোমরা বাপু বড্ড সেকেলে। সত্যযুগে বসে নেটচর্চা-পরচর্চা করো। তোমাদের সাথে খেলায় পারি না গো।

সম্মিলিত নেপথ্য কণ্ঠ: পারি না গো। পারি না গো। হি হি হি।

নেপথ্য কণ্ঠ 1 : তাই প্রতিদিন খবরের কাগজ আসে দরজার তল দিয়ে। দরজার তল থেকে হাতে। হাত থেকে মগজে। মগজ থেকে মগজে। তারপর আবার কাগজে। খবর আর অ-খবর পরিবহন প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

সম্মিলিত নেপথ্য কণ্ঠ: গুরু, অনেক স্টান্টবাজি করলেন। কথা না বাড়িয়ে আজকের খবরটা শোনান। আপডেটেড থাকতে চাই আমরা। আপডেটেড।

আজকের খবর। গতকাল রাতে 'এনকাউন্টারে' এক রিকশাআরোহী ট্যাগিত। কর্তব্যরত কর্তৃপক্ষ ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। পুলিশসূত্রে জানা গেছে, ...

খবর পড়ে, মর্নিংওয়াক শেষে, অতিউৎসাহী জনাকয় প্রবীণ সে রাস্তা দেখতে যান। রাস্তায় কিছু ছেড়া ট্যাগ পড়ে আছে। সেগুলো কুড়িয়ে নেন একজন। পড়ে শোনান, জোরে জোরে। আমরা শুনতে পাই কথাগুলো :

আধা-হেগেলিয়-যুগে-প্রাপ্ত-রেফারেন্সওলা লাইনছাড়া বামকর্মী।
অসৎ-ভণ্ড-মার্ক্সীয়-কথাজীবীর ভাবশিষ্য।
বুদ্ধিবৃত্তিক-গণিকালয়ে গমনকারী।
ফমজারিয় বিভ্রান্তিতে পড়া কিছু আবর্জনার পাঠক।
ফমজারের ডট ডট ডট (বাকিটুকু পড়া যায় না, ছেড়া)।
ইসলাআআ সমাজতঅঅঅ চ্যাঅ্যাঅ্যা (লেখা বোঝা যায় না, অস্পষ্ট)।

তারা পার্কের ধারে বেঞ্চিগুলোয় বসেন। একটু জিরিয়ে নেয়া দরকার। সাথে আড্ডা চলে। থিয়েটার অব অ্যাবসার্ডের ক্যাসেট চালু হয়।

ভাবীকে সালাম দিবেন। অনেকদিন উনার হাতের রান্না খাওয়া হয় না। মেয়েটার ভালো প্রস্তাব এসেছে, ছেলে ফ্লোরিডায় থাকে, এমপির ভাতিজা। পল্টুটার বোধহয় মাথা গেছে। সারারাত কম্পুটারে কী সব টাইপ করে। নিজে নিজেই হাসে খালি। সকালে ওঠে দেরি করে। আপনার ভাবী কিছু বললেই রেগে যায়। বলে, ডিসটার্ব করো না। ব্লগ করি। অ্যাজাক্স প্রোগ্রামিং করি। এই সেই। আজকালকাল ছেলেমেয়েদের মুখের কথাই তো বুঝি না। আরে নাহ, এখনও তারিখ পাকা হয় নাই। ওহ্হো, তিন তারিখের ফ্লাইটে আসছে ছোট মেয়েটা, জামাইকে নিয়ে। তা সামনে কাকে ভোট দিবেন? বাসায় আসবেন কিন্তু। আরে গতবার যে এমপি ছিল আমাদের এলাকায়, তার ভাতিজা। ছেলে এখন আমেরিকায়, প্রস্তাবটা ভালোই। অনেকদিন ভাবীর হাতে রান্না খাই না। উনাকে সালাম দিবেন।

ট্যাগে লেখা শব্দগুলোও উঠে আসে আড্ডায়। সারা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে শব্দগুলো পুনর্মূল্যায়ন করেন তারা।

বেলা বাড়ে। হাঁপিয়ে উঠেন এক সময়। যে যার বাসার দিকে রওনা হন সবাই।

একজন বাদে।

- সিকোয়েন্স চার -

ডাইনিং রুম। দুপুর বেলা। শব্দ নেই।
খাবার টেবিলে প্লেট সাজানো। মুড়ি রাখা তাতে।
টেবিলের একপাশে খবরের কাগজের স্তুপ।
প্লেটের পাশে রাখা সেই ছেড়া ট্যাগগুলো।
একটু দূরে আঠার কৌটা। মুখ খোলা।



[- পরবর্তী কিস্তি : ভাবনার স্প্রে ০০২ - ]

Monday, March 27, 2006

কারণ আমরা মাদ্রাসায় পড়ি [চিন্তা থেকে]

[চিন্তা পত্রিকা থেকে একটা লেখা তুলে দিয়েছিলাম সামহোয়্যারইনব্লগে। লেখাটির লেজ ধরে পাঠকদের কাছ থেকে অনেক প্রতিক্রিয়া আসে। প্রতিক্রিয়াগুলো আমাকে 'ভাবনার স্প্রে 'সিরিজ লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। আগে চিন্তা পত্রিকার লেখাটি পড়ুন ।তারপর মন্তব্য ঘরে সে প্রতিক্রিয়াগুলো ।]

জানি আমাদের মা 'ম্যাগী পাকা রাঁধুনীর' মতো চটপট নুডলস করে খাওয়াতে পারে না কখনোই, জানি ইউনিলিভারের জাদুতে আমরা স্টার হয়ে উঠবো না, জানি মেছওয়াকের বদলে আমাদের দাঁত ঝকঝকে হচ্ছে না পেপসোডেন্টের ফেনায়, আমরা এখনও জানতে পারিনি পোকেমন মিকিমাউস, আমাদের বাবারা বারবি পুতুল কিনে আনছে না, আমাদের তৃষ্ণার জল হয়ে উঠছে না লাল ঝাঁঝালো পেপসির বোতল, মোবাইল কোম্পানিগুলান আমাদের টাঙাবে না নগরীর বিলবোর্ডে, মুনাফা উপযোগী ডিজুস জীবন-- আমরা পারি না ডট কমের আদর্শ ভোক্তা হতে, জানি তাই খরচযোগ্য সংখ্যা (মানুষ নয়) হিসেবে আমাদের দিকে তাক হয়ে আছে যাবতীয় সশস্ত্র দৃষ্টি-- নির্মূল অভিযান। জানি আমাদের দিকে সতর্ক-নির্দ্বিধায়-সন্দেহ-ঘৃণায় তাকাবে গোয়েন্দা-পুলিশ-বুদ্ধিজীবী প্রগতিশীল-রাজনীতিক-লড়াকুরা।

কারণ আমরা মাদ্রাসায় পড়ি।

আমাদের কোনো 'হরলিক্স প্রতিভা' নাই, এত এত রাষ্ট্রীয় আন্তঃক্রীড়া, নিরক্ষরতা দূরীকরণ-গণশিক্ষা-স্বাক্ষরতা-সর্বজনীন-উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, জাতীয়(!) টেলিভিশন পার্লামেন্টারি ডিবেট (ইংরেজিতে) 'রুখবে আমায় কে'র বাহারি শ্লোগানের কোথাও আমাদের জায়গা নাই। জায়গা নাই মান্দি চাকমা সাঁওতালসহ সকল আদিবাসী প্রান্তিক মানুষের। সবখানে আমাদের অস্তিত্ব সচেতনভাবে মুছে ফেলা হয়। সকল বিরাজমানতা উপস্থাপন প্রতীক ও পরিচয়ে আমদের মুখগুলা দেখা যায় না।

আপনারাই রাষ্ট্র, আপনারাই সন্ত্রাস। সমস্ত ইতিহাস-লড়াই-ভিন্নতা মুছে দিয়ে, 'জঙ্গি' 'মৌলবাদী' তৈরির 'একক-অভিন্ন' কারখানা মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে আপনারা কেন বারবার ম্যাগী-কোকাকোলা-লিভাইস-ম্যাগডোনাল্ড-সিনজেন্টা-বাংলালিংকসহ মারদাঙা সব বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত জীবন কল্পনার শিক্ষা ব্যবস্থাকে 'আধুনিক' 'প্রগতিশীল' আর 'সর্বজনীন' করে তুলেন? কেন?

আমরা গ্রামের গরিব কৃষক খেটে খাওয়া মানুষের সন্তান, আমাদের মায়েরা-বাবারা কৃষকের বুকের ধন শস্য বীজ লুট করে হাইব্রিড-জিএম বীজের ব্যবসা করে না, আমাদের আত্মীয় পরিজন কেউ নাইকো-শেল-ইউনোকলের কাছে মাটি-জঙ্গল-জীবন বন্ধক দেয় না।

তবু আমরাই বিপজ্জনক।

মাদ্রাসায় পড়ে পড়ে বড় হয়ে মানসান্তো ইউনিলিভার নেসলে মটোরোলায় চাকরির লাইন না দিয়ে 'জঙ্গি' আর 'মৌলবাদী' হয়ে যাই।

তথাকথিত একতরফা পশ্চিমি যে ধারণা মাদ্রাসাকে টুপি-দাঁড়ি-বোরখাকে আমাদের সামনে 'মৌলবাদ' বা 'জঙ্গি' হিসেবে হাজির করার বাহাদুর দেখায়... আমরা জানতে বুঝতে খুঁজতে চাই সেইসব 'বাহাদুরির' রকমফের দাপুটে কাণ্ডকারখানাগুলান।

'বাহাদুরি'-কে আর কতকাল 'প্রগতিশীলতা' হিসেবে চালানো ও চাপানো হবে?
___________________________________
নোট 1 : লেখাটি পাক্ষিক চিন্তা পত্রিকার সন্ত্রাস সংখ্যা (প্রকাশকাল: নভেম্বর 2005) থেকে নেয়া। পেছনের ফ্ল্যাপে ছাপা হয়েছে লেখাটি। লিখেছেন পাভেল পার্থ, মুনেম ওয়াসিফ ও মুসতাইন জহির। ছবি তুলেছেন মুনেম ওয়াসিফ।

নোট 2 : পোস্টের শিরোনাম আমার দেয়া। মূল লেখার বানানরীতি অনুসরণ করিনি।

চিন্তা নিয়ে চিন্তা

মাসখানেক আগের কথা। জ-এর সাথে দেখা, শাহবাগে। তার সাথে শেষ কাজ করেছি 2004-এ, চলচ্চিত্র উৎসবে। তারপর যোগাযোগ বলতে গুটিকয়েক ই-মেইল চালাচালি, ব্যস। কী করছেন এখন, জিগ্যেস করি। 'চিন্তায় আছি,' সংক্ষেপে জবাব। বাহ, চিন্তায় কে না থাকেন! কী নিয়ে চিন্তা? ঝেড়ে কাশতে বলি। নিয়ে গেলেন আজিজ সুপার মাকের্টের ভেতরের এক দোকানে। পত্রিকা কেনালেন। 'চিন্তা' পত্রিকা। ফরহাদ মজহারের সম্পাদনায় 'চিন্তা'। এবার 'চিন্তায় থাকা'র ব্যাপার খানিকটা বোঝা গেল। এ পত্রিকা না মাঝখানে অনেকদিন বন্ধ ছিল? জানালেন, নতুন করে আবার শুরু হয়েছে, এবার নিয়মিত বের হবে।

সঙ্গে ছিল বন্ধু ব্র। আমাদের আলাপে মন নেই তার। দোকানে বই ঘাঁটাঘাঁটি করছে। ব্র-এর মাথায় ইদানীং জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার ভুত ঢুকেছে। প্ল্যান : এ নিয়ে যত বই আছে, সব কিনে ফেলবে। কিন্তু কোনটা কিনে যে শুরু করা যায়, সে নিয়েই চিন্তা।

'চিন্তা' আমার হাতেই। ফ্ল্যাপে লেখা : চিন্তা ও তৎপরতার পাক্ষিক। পাতা উল্টাই। এবারের বিষয় 'সন্ত্রাস'। সম্পাদকীয় নেই, সূচি নেই, পত্রিকার দাম কত তাও নেই। প্রথমেই লেখা দিয়ে শুরু। সম্পাদকীয় পাওয়া গেল একদম শেষের পৃষ্ঠাগুলোতে, ক্রেডিট লাইন আর দামটাও। অভিনবত্ব আনতে গিয়ে পাঠকদের বিপদে ফেলার কী মানে? নাকি বাংলা ভাষায় আরবি পত্রিকার স্বাদ?

'এবার কয় মাস পর পর বের করবেন পাক্ষিকটি?'
পুরনো রসিকতা আমার।
হাসেন।
'না না, পরের সংখ্যা প্রেসে। সত্যি... পত্রিকা পড়ে ফিডব্যাক জানাবা অবশ্যই।'

পত্রিকা পড়েছি। ফিডব্যাক জানানো হয়নি এখনও। এর জন্য নিজের অলসতাকে দায়ী করে সুখ পেয়েছি।

দীর্ঘদিন ফরহাদ মজহারের লেখা পড়িনি। বলতে দ্বিধা নেই, তার লেখা ভালো লাগে আমার। অনেকের চেয়ে স্বচ্ছ লিখেন তিনি। বিশেষ করে মার্কস-অ্যাঙ্গেলস এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বেলায়। কবি হিসেবে অনেকের কাছে আদৃত, যদিও তাঁর কবিতার সাথে সেরকম পরিচয় নেই। ভালো-লাগা শুরু হয় তাঁর এক নিবন্ধ পড়ে। গণিত আর যুক্তি বিষয়ক লেখা। 'মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা'র গণিত ভলিউমে ছাপা হয় সেটা। সম্ভবত প্রতীকী যুক্তিবিদ্যার প্রথম পাঠ সেখান থেকে, সজ্ঞানে-স্বেচ্ছায়। (হাতের কাছে এ মুহূর্তে গণিত ভলিউম দুটো নেই। একটা সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন বোধহয়। কবি, কবিতা আর গণিত নিয়ে। ভিন্নধর্মী ছিল। সরসও।)

দ্বিতীয়বার ভালো লাগে আরেকটি নিবন্ধ পড়ে, লালন ফকিরকে নিয়ে তার মূল্যায়ন জেনে। প্রথম আলো পত্রিকায় ছাপা হয়, সম্ভবত 2000 সালে। লালন আখড়া নিয়ে খুব হইচই হচ্ছিল তখন।

পাশাপাশি ফরহাদ মজহারকে ভয়ও হয়। এই যে তাঁর এনজিও উবিনীগ, তাঁর নয়াকৃষি আন্দোলন-- এসবের ফান্ড নিয়ে নানা কথা কানে আসে। পরিবেশ রক্ষায় হাইব্রিড-জিএম বীজের বিপক্ষে এত যে প্রচারণা, তাতে যুক্তি আছে। কিন্তু এ প্রচারণার সাথে ইউরোপিয় ইকনোমিক কমিউনিটির (ইইসি) কোনো দহরম-মহরম আছে কিনা, থাকলে কার উদ্দেশ্য কেমন-- এরকম আরো অনেক প্রশ্ন আর উত্তর মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করে।

কাউকে ভালো লাগালে তাকে স্বচ্ছতার দাঁড়িপাল্লায় মেপে নিতে দোষ কী? ভক্তিটা, শ্রদ্ধাটা বরং মজবুত হয়।

ফিরে আসি 'চিন্তা' পত্রিকার 'সন্ত্রাস' সংখ্যায়। নাদের ভোসেগিয়ানের অনুবাদ-লেখা দিয়ে আরম্ভ । লেখার শিরোনাম 'দেরিদা, হেবারমাস এবং সন্ত্রাসকালে দর্শন: জিওভান্না বোরাদরির সঙ্গে আলাপ'। পরের লেখাটি ফরহাদ মজহারের। 'সন্ত্রাস, আইন ও ইনসাফ' শিরোনামে। তারপর আবার অনুবাদ-লেখা। ওয়াল্টার বেনজামিনের 'বলপ্রয়োগ বিচার'। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে একবাল আহমেদের ভাষণ আর তালাল আহমেদের সাথে আলাপ আছে। সলিমুল্লাহ খান লিখেছেন এডওয়ার্ড সায়ীদ, ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে। ফরিদা আখতার লিখেছেন 'বিশ্ববাণিজ্য চুক্তির সন্ত্রাস : হংকং সভা' শিরোনামে। নয়াকৃষি আন্দোলন ও চতুর্থ সার্ক পিপলস ফোরাম নিয়েও কয়েকটি লেখা আছে। শেষ ছয় পৃষ্ঠা জুড়ে সম্পাদকীয়। এত দিন পর চিন্তা বের করার কৈফিয়ত দেয়া। সাথে পত্রিকাটি কী জানাতে চায়, তার বয়ান। পরবর্তী সংখ্যার বিষয় 'সাম্রাজ্যবাদ : যুদ্ধ ও বাণিজ্য'। এর মধ্যেই বের হবার কথা।

সমান্তরাল কিছু ভাবনার কথা বলি। বিষয় যখন সন্ত্রাসবাদ, প্রসঙ্গ যখন জাঁক দেরিদা-একবাল আহমেদ-মিশেল ফুকো, লেখাগুলো স্বভাবতই কঠিন ঠেকতে পারে। ঠেকেছেও। নিজের কাছেই প্রশ্ন করতে থাকি। কতজন হবেন এ (ধরনের) পত্রিকার পাঠক? ডিসকোর্স, ডিকনস্ট্রাকশন, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম, নিওকলোনিয়ালিজম- এমন নানারকম শব্দ পড়ছি, শুনছি, পরিচিত হচ্ছি। আমাদের কত জনের জাঁক দেরিদা পর্যন্ত যাবার সুযোগ হয়? সলিমুল্লাহ খানে গিয়েই ভক্তি (বা অভক্তি) আটকে যাচ্ছে না তো? যিনি 'ভাষার বিনির্মাণ' পড়াচ্ছেন, তিনি নিজেই ভাষা বিনির্মাণ করে চলছেন না তো?

বিষয়ের গভীরে গিয়ে চিন্তা করতে পারছি তো? নাকি 'চিন্তা করছি' বলাটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

চিন্তার ব্যাপার অবশ্যই। তৎপরতারও।

[নোট : এ লেখা প্রথম ছাপা হয় সামহোয়্যারইনব্লগে।]